শনিবার, ৬ অক্টোবর, ২০১২

আমাদের চুনকালি মুখে ছিটিয়ে দিবি গর্বের গণ্ডূষ জল

স্মৃতি ও বিস্মৃতির পর্দায় খেলা করে পড়ন্ত সূর্যের ক্ষীণ আভা:

অগ্রহায়ণের পড়ন্ত বিকেলে সূর্যটা যখন ডুবু ডুবু করছে, তখন আমার হাতের পাঁচ আঙুল কিলবিল করে উঠছে স্মৃতি ও বিস্মৃতির পর্দায়। মৃদমন্দ শীতে গা এলিয়ে দিয়ে সূর্যের ক্ষীণ আলোকরশ্মি যেন উপহাস করছে। সংশয় ভরা চোখে আমাকে অনুবাদ করতে চাইছে । একটা ভয় সদর্পে এসে জায়গা করে নেয় নি:শ্বাসের আগায়।  আমি কি টুল-বেঞ্চের দিনগুলির স্রষ্টার নির্মিত চরিত্রসমূহ বিশ্লেষণের যোগ্য উত্তরসূরি? অর্ধশতাব্দী কাল পার করে দিয়ে যেসব চরিত্রসমূহ এখন বার্ধক্যের দোড়গোড়ায় সন্তর্পণে কড়া নাড়ার কথা, তাদের যৌবনের তেজকে দুহাতে আলিঙ্গন করতে গেলে সাঁতরে আসতে হবে প্রাণোচ্ছল কর্ণফুলীর শত শত বছরের বিশুদ্ধ জলে। সুচরিত চৌধুরী, অধমের সীমিত পাঠমতে, বাংলা গল্পে মৌলিক প্রাণ সঞ্চারি এক কারিগর। সাহিত্যের কানাগলিতে হামাগুড়ি দেয়া নবিশ পাঠকের এতদিন সুযোগ ও ক্ষমতায় কুলোয়নি এই বটবৃক্ষের ছায়ায় সদর্পে জিরিয়ে নিতে। এই ব্যর্থতা কেবল আমারই নয়, দায়ী অগ্রজ সারথীরাও, যারা প্রায় প্রতিদিনই লাল-নীল-সবুজ হোটেলের আড্ডায় বিদেশী অজগরের মাংস আর আফিমের নেশায় বুদ হয়ে পার করে দিয়েছেন দশকের পর দশক। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় যাকে লুটেপুটে নিয়েছে তার অনুজ অনেক লেখকই। সুকৌশলে যারা আবার এই মহীরুহের আড়ালটাকে উন্মুক্ত হতে দেয়নি। এমনটাই হবে এটা বুঝি তিনি অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিলেন। এই অনুজদের চরিত্রকে  মুন্সিয়ানায় গেঁথেছেন নির্লিপ্ত ঢঙে:      

...তারপর ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় কফির চুমুকে চুমুকে এগিয়ে চললো কথা। কথার পরে কথা। এজরা এলো, গেলো মান, বোদলেয়ার, র‌্যাঁবো, ডস্টয়ভস্কি, ভেরলিন-এই আসে এই চলে যায়। মালার্মে, জুপেরভিল, - সবাই কথার তোড়ে ভাসতে ভাসতে আসে। বাদ যায়না চেয়কভস্কি, শাফেরিন, পিকাসো-কনি ফ্রান্সিস পর্যন্ত।...
একটি গাছ, ছায়া নেই

বাদ পড়ে গেলেন কেবল সুচরিত চৌধুরী । শেষকৃত্যের পর উন্মোচিত স্মারকগ্রন্থের পাতার মতো যদিও মাঝেমধ্যে ফাৎ করে জ্বলে ওঠেন তাকে নিয়ে অগুনতি গুণী লেখকের কীর্তনে, তা যেন বড়ই উপহাস করে বাঁশির সুরে স্বর্গলোক মাতিয়ে রাখা এই শিল্পীকে।

সেসব চরিত্র গাছেরই সহোদর যেন আপন শেকড় দিয়ে রস টেনে বাড়ন্ত হয়:

সুচরিতের সাহিত্যের বিস্তৃত পরিসর নিয়ে আলোচনা করার স্পর্ধা আমার নেই। তার চিন্তার সমগ্রতায় অবগাহন করতে গিয়ে যেসব মণিমুক্তা কুড়ানো গেল আনাড়ি পাঠে, তার সবিশেষ বয়ানই হবে এই লেখার আরাধ্য। তার চরিত্রের ভাষা স্পষ্ট। অঘ্রাণ মাসের ফসলি জমিনের উপর ঠাই দাঁড়িয়ে থেকে শস্য লুট করতে আসা পাখিদের ব্যঙ্গ করা কাকতাড়–য়াদের মতো জীবন্ত। এসব চরিত্র আমাদের আশেপাশেই সন্তর্পনে পায়চারি করে।  ধীরে ধীরে অনুভবে ঢুকে পড়ে। ক্লিশে জীবনযাপনের বাইরে অন্যকিছু ভাবতে না শেখা অস্থির সামাজিক মানুষের ভেতর ক্রমাগত চাপ তৈরী করার চেষ্টা চালায়। তারা কী আমাদেরই মানুষ? এই ‘আমাদের’ শব্দটাকে কেন্দ্র করেই তার সাহিত্য কর্মের একটা  দিকের উপর আলোকপাত করার প্রয়াস থাকবে লেখায়। এই সব চরিত্রের স্রষ্টা অবিভক্ত রাজনৈতিক ভুখন্ডের মানুষ। কৈশোরের তেজ বাড়-বাড়ন্ত হতে না হতেই  তীব্র আলোয় জ্বলসে উঠতে দেখে এই ‘আমাদের’ ও ‘ওদের’ বিস্ফোরণ। নির্ভার দৃষ্টিতে জন্ম হতে দেখে ‘মৌলবাদ’ ‘সাম্রাজ্যবাদ’ কিংবা ‘সা¤প্রদায়িক স¤প্রীতি’র মতো অসম্ভব সা¤প্রদায়িক কিছু পরিভাষার। যে ‘আদার’ শব্দটিতে অনতিতরুণ পাঠকও এখন খানিকটা নিষ্ঠায় কিংবা কৌতূহলে রস আস্বাদনের চেষ্টা করে তাদের কথা ভেবে বোধকরি তার অমর চরিত্রগুলোর জন্ম হয়নি। অথচ কী আশ্চর্য, তার সময়ে তিনিই সম্ভবত অনাবিস্কৃত এই আদার-ভূগোলের সবচেয়ে সফল গীতিকার! সুচরিত আমাদেরই শুধু নন, এই ভূগোলেরই একজন ‘অপর’। টুলবেঞ্চের যে দিনযাপনের ভেতর পাঠক সন্তর্পনে ঢুকে পড়ে তার পরতে পরতে তিনি জাগিয়ে তোলেন আমাদের মৃত ও পরিত্যক্ত হয়ে ওঠা জীবনকে। সেসব চরিত্র নিজের শেকড় দিয়ে রস টেনে বাড়ন্ত হয়। শিকলভাঙার এক মাঝির ছেলে আজিজ তার ঘাম ও বৃষ্টির ফোঁটার সখ্যকে জানিয়ে দেয় নির্লিপ্তির তীক্ষ্ম ফলায়, ‘আমন ধান বর্ষাকালে পাকে না।’ সর্বগুণে চৌকস রায় বাহাদুরের ছেলের নিজের লেখা গ্রামের চিত্রের মেকি বয়ানকেই আজিজ ব্যঙ্গ করে না। তা হয়ে উঠে এই গোলকের শ্রেণী বৈষ্যম্যের বিরুদ্ধে এক তীব্র সংশোধনী।  তার গল্পের সারথীরা ক্রমাগত এ ধরণের সরল প্রতিবাদের মধ্যদিযে মধ্যবিত্ত পাঠকের সংশয়কে বারবার পরিষ্কার করার তাগিদ অনুভব করে। গল্প বারবার বাঁক নেয় একটি নিশ্চিত সমাপ্তিকে পা দিযে মাড়িয়ে আরেকটি সম্ভাবনার দিকে। ‘জলিল মাঝি’, ‘কালু মাঝি’, কালো দীর্ঘ বিরাটদেহী  ‘বুড়ো রোকন’, ‘রূপকার কুঞ্জবাবু’, মেথর পট্টির ছোকরা ‘বাবুলাল’ কিংবা সমুদ্রের পালিত সন্তান জেলেসর্দার ‘বুধারাম’ যে পরিসরে নেতিয়ে পড়া সমাজের ‘বাবুমিয়া’দের ব্যক্তিত্বের দোড়গোড়ায় ক্রমাগত ঘা দিয়ে উপহাস করে গল্পগুলোর ভেতর দিয়ে, তা বোধকরি ক্রমশ বিকৃত হয়ে ওঠা একটি সামাজিক ব্যবস্থার মর্মপীড়নের অনবদ্য দলিল। তার গল্পের সবুজ অরণ্যে যদিও এই নোনা ভূখণ্ডের অলংকার স্বরূপ বিদ্যমান বৃহৎ ‘অপর’ নৃগোষ্ঠীগুলোর জীবন যাপনের চিত্রায়ন অনুপস্থিত, তথাপি বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান ও ধর্মীয় পরিচয় থেকে উৎসারিত উভয় প্রকার সংখ্যালঘুত্বের কারণেই বোধকরি তার সৃষ্ট নিুবর্গীয় চরিত্রগুলো যখনই হাতের ছোঁয়া পায়, যেন গেয়ে উঠে বুনো পাখির মতো। হোক সে ধর্ম পরিচয়ে মুসলমান অথবা হিন্দু। হিন্দু-মুসলমানের জাতিগত অপরীকরণের যে ইতিহাস আমরা বয়ে বেড়াচ্ছি শত শত বছরের অনাচারে আরো সর্মৃদ্ধ করে, তার গল্পের চরিত্রগুলো যেন সে সাক্ষ্যই দেয়। ইংরেজি কাস্ট শব্দের ভারতীয় প্রতিশব্দ যেটা করা হলো  ‘জাত’ হিসেবে, ইউরোপীয়দের আগমনের পূর্বে অবিভক্ত ভারতবর্ষে এ শব্দ দুটোরই উৎপত্তি হয়নি। এর গোড়ায় আছে পঞ্চদশ শতকের শেষার্ধ থেকে সপ্তদশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত দলে দলে ভিড় জমানো পর্তুগিজ বণিকের বিষাক্ত হাত। পর্তুগিজ ভাষায় এই শব্দটি ব্যবহার করা হতো মানুষের ট্রাইব, রেস, প্রফেশন ইত্যাদিকে বুঝানোর জন্য। নানা বর্ণ ও প্রথায় ক্ষত-বিক্ষত ভারতীয় সামাজের এই কাস্টিং মেকানিজমের প্রসারে ঔপনিবেশিক ইউরোপীয়ানদের বেনিয়া মানসিকতার প্রভাব স্পষ্ট ও অবিচ্ছেদ্য। গোড়ার কাজটা পর্তুগিজরা করে গেলেও তা থেমে থাকেনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ঠিক একশ বছর আগে ১৮৭১ এ বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসকগোষ্ঠী ভারতবর্ষের মাটিতে তা আরো পোক্ত করে। সে সময় আদমশুমারি করতে গেলে তারা সমস্ত ভূমিপুত্র হিন্দুদের চারটি বর্ণের মধ্যে ফেলে কাজটি করার নির্দেশ দেয়। যাদের ক্ষেত্রে এই বর্গীকরণ সম্ভব ছিল না তাদেরকে আউটকাস্ট বা এবরজিন হিসেবে বর্গায়িত করে। ঠিক এক দশক পর সে ধারা আরো কঠোরভাবে পালনের হুকুমনামা জারি করা হয় এবং অসা¤প্রদায়িকতার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকতে নিয়োগ দেয়া হয় কিছুসংখ্যক সংস্কৃত ভাষার পণ্ডিত। দখলবাজ ও দেশী দোসরদের কল্যাণে হিন্দুসমাজে দাঁড় করানো হল একটি আধিপত্যবাদি সামাজিক কাঠামো যার রেশ ছড়িয়ে পড়ে অবিভক্ত ভূখণ্ডের প্রতিটি ঘাসের গোড়ায় গোড়ায়। যারা ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকে অপরীকরণের সক্রিয় পক্ষ মূলত তারা। এদের হাতেই থাকে ভেদাভেদ নির্ণায়কের যাদুর পুতুল। ক্ষেত্রবিশেষে প্রান্তিক বা নিুবর্গীয় দলের নিজেদের ভেতরেও এই অপরায়ণের প্রতিযোগিতা তৈরী হয়। ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে উৎসারিত রসের তলানিটুকুতেই তাদের যত লোভ। শক্ত ও দূর্বলের মধ্যে চলামান এই অপরীকরণ বৃটিশ ভারতে প্রথমে ভিত পায় হিন্দুদের মধ্যে। পরবর্তীতে মুসলমানদের মধ্যেও তা ঢুকে পড়ে। আশরাফ আর আতরাফের যে বিভাজন কিংবা অধুনা বিকশিত আহলে সুন্নাতে ওয়াল জামাতের সাথে ওহাবি নামে পরিচিতি লাভ করা দেওবন্দপন্থী কওমি আকিদার যে বিরোধ তারও ভিত্তি কিন্তু বৃটিশ-ইউরোপীয় বেনিয়াদের হাতেই। তার গল্পের রাজনৈতিক ভাষ্য পরিচ্ছন্ন ও সুনির্দিষ্ট বহু অর্থেই। ‘সুজাতা’ গল্পের ভেতর দিয়ে সাতচল্লিশের দেশভাগ পরবর্তী গজিয়ে উঠা ক্রাউন সমাজের অর্থ ও প্রতিপত্তির লোভে নপুংসক হয়ে উঠার বিবরণ উঠে আসে কী অবলীলায়:

...তাদের না ছিলো আদর্শ, না ছিলো ধর্মের সাধনা, জ্ঞানচর্চা তো দূরের কথা- নোঙ্গর ছেঁড়া নৌকার মতো তারা সমুদ্রে ভাসতে গিয়ে বিকৃত বিলাসবহুল এক দ্বীপের গাযে আটকে পড়েছিলো, যে দ্বীপে চটুল ঠুনকো  রঙীন ফানুস কেবল মানুষকে পাপাচারের জগতে প্রলুব্দ করে। বাঁশির অনুষ্ঠান করতে গিয়ে এই সমাজের নরনারীকে আমি দেখতে পেতুম। হুবহু তাদের চরিত্রগুলোকে তুলে ধরতুম গল্পে।....সুজাতা

যে বয়ান গল্পে ঢুকে পড়ে তা যেন অন্যকারো  মুখ থেকে উৎসারিত হয়না। সময়ের বাঁকে বাঁকে দাগ কেটে খোদ লেখকই যেন দাঁড় টেনে যাচ্ছেন কালো অক্ষরগুলোর আড়াল থেকে।

যে নিবিড় মগ্নতায় তিনি নির্মান  করে গেছেন ‘অপর’ চরিত্রগুলোকে তারা সুযোগ পেলেই তৈরী করে নিয়েছে প্রতিবাদের ভাষা। ‘নিঃসঙ্গ নিরাশ্রিত’ গল্পের পৌরাণিক দানবের মতো দেখতে সেই কালো দীর্ঘ বিরাটদেহী বুড়োটা  কি একবার বিলাতফেরত বাঙাল সাহেবকে কোট-পাতলুন খুলে রেখে দেয়নি? কেবল অমুক সাহেবের জামাই বলে জেলের ভয় দেখালো বলে? তরুণ রোকনের মন কী করে পেয়েছিল এত জোর? একরোখা তরুণ সাহসের রসদ খূঁজে নিয়েছিল পাহাড়তলী জালালাবাদে লড়াই করা কচি জোয়ানদের বীরত্বে। ১৭৫৭- এর পর ওহাবী আন্দোলনের সময়কাল কিংবা সীপাহীদের সশস্ত্র অভ্যুত্থানও যেখানে বৃটিশদের কাছে হার মানে, সেখানে ১৯৩০ এর চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখল ও জালালাবাদ পাহাড়ে কয়েকশ সেনাবাহিনীর সাথে বিপ্লবীদের সম্মুখযুদ্ধ বৃটিশ শাসনের দেড়শ বছরের শাসনকালে খানিকটা পরাজয়ের স্বাদ গলদগরন করতে বাধ্য হয়। এই যুদ্ধ কেবল রেকনকেই জাগ্রত করেনি, সূর্যসেনের নেতৃত্বে এই অভিযানের সাময়িক জয়ের মূল্য মূলত সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশ শাসনের কড়াল গ্রাস থেকে মুক্ত হবার প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল রোকনের মতো আরো অনেক তারুন্যের হৃদয়ে।

ডোবা সূর্যের ম্লান আলো ছড়িয়ে পড়ে ডেপুটি সাহেবের বাগানে:

সুচরিত চৌধুরীর প্রায় প্রতিটি গল্পে রোদে পোড়া কৃষকের গায়ের ঘামের মতো লেপ্টে থাকে মুক্তিকামী পালাকারের এক তীব্র সুর। তার ‘অপর’ চরিত্ররা যদিও সর্বদা সময়ের দাসত্বকে অতিক্রম করতে  সফল হয়না, তা যেন দহনের জ্বালা থামাতে আরো বেশি কোরাসে মেতে ওঠে। ‘ঝাউতলা’ গল্পের ‘বাবুলাল’ নামের ছোকরাটা শেষতক হারলেও মেথরের বাচ্চা হয়ে সাহেবের ঘুড়ি উৎসবের রঙে মাঞ্জার বিষাক্ত বিষ ঢেলে জয়ী হবার ক্ষমতা রাখে।  ডোবা সূর্যের ম্লান আরো ছড়িয়ে দিতে পারে ডেপুটি সাহেবের বাগানে। প্রশ্ন করতে শেখে ইয়ে ঝাউতলাকা জিন্দেগী নিয়ে। সুবে ময়লা সাফা করা, শামকো দারু পিয়ানো ঔর রাতমে পুলিশকা ডাণ্ডাবাজীর জিন্দেগীকে অতিক্রম করে এক রোজ সে ঠিকই শুনে ঝাউগাছকা উপের উথারকে সমুদ্দুরকা আওয়াজ। যে সৃষ্টিশীল যন্ত্রণায় পীড়িত হয়ে সুচরিত চৌধুরী নিজেকে লেখক বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন না, সৃষ্টির ভেতর দিয়েই তিনি রেখে যান প্রকৃত ও ক্ষণজন্মা লেখকের মৌলিক উচ্চারণ। সাহিত্য বলতে যিনি বুঝতেন লোক সাহিত্য, মেধা ও মননের শান দেওয়া তলোয়ারে তিনি ফালা ফালা করে দিয়ে যান ফিকে আধুনিকতার খোলস। ‘দুলুকে দেখেছেন?’ গল্পে যে আধুনিক মানুষের পাশবিক মূর্তি অঙ্কিত হয়, তা পাড়ভাঙা দীঘির গোলা জলের মতো আমাদের দৃষ্টিকে ঝাপসা করে দেয়। নিষ্টুর ও অর্থলিপ্সু কুকুর হয়ে উঠা মানুষের ভেতর যে নিষ্পাপ দুলুটি থাকে, সে বারবার আঘাত হানে বিবেকের কুঠার দিয়ে। শৈশবের জীবন্ত আত্মাটি যেন যৌবনের মৃত মানুষটিকে টেনে তুলতে চায গভীর খাদ থেকে। লোলুপ ও মেকি আধুনিকতার জারজ সন্তানে পরিণত হয়ে ওঠা মানুষের ভেতরের নিষ্কলংক সত্তাটির প্রতীক হয়ে ওঠে দুলু নামের অলীক নামটি।  গল্পের উজ্জ্বল সংকেতময়তার এই দিকটি সুচরিতের অনবদ্য প্রতিভার চূড়ান্ত স্বক্ষর। ‘অপর’ চরিত্রের অসামান্য চিত্রায়নের বাইরে তার গল্পের যে বিশেষ ক্ষমতা আমাদের পাঠরুচিকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয় তা সম্ভবত গদ্যে তীব্র সংকেতময়তার গতিময় ব্যবহার। ‘আকাশে অনেক ঘুড়ি’ গল্পে ছোট্ট ছেলের চরিত্রটির যে বিমূর্ত ও সংবেদনশীল নির্মাণ, বাংলা গল্পের ভাণ্ডারে এমন চরিত্র সম্ভবত খুব বেশি জমা হয়নি। সুচরিতের জ্ঞানবৃক্ষের  ফোঁটা ফোঁটা রস যেন তৃপ্তির নেশায় বুদ হয়ে মগজের কোটরে দ্রুত ঢুকে পড়ে । অগ্রহায়ণের পেলব শীতের মায়ায় জড়িয়ে রাখে আবেশে। আর ঘোরগ্রস্ত বৃদ্ধ ‘কালু মাঝির’ অবাক চাহনির মতো নির্ভার দৃষ্টিতে গুণে চলে এই ভূগোলের শত শত কোটি মাথার খুলি।

রচনাকাল: অগ্রহায়ণ, ১৪১৬ ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন